অদ্বৈত বেদান্ত: পরিচয় পর্ব

ভারতীয় দর্শন নিয়ে কথা উঠলেই সবার আগে যে নামটা মাথায় আসে, তা হলো 'অদ্বৈত বেদান্ত'। কথাটা শুনতে একটু ভারী মনে হলেও, এর পেছনের ভাবনাটা কিন্তু দারুণ।

সহজ কথায় বলতে গেলে, 'অদ্বৈত' মানে হলো 'দুই নয়' অর্থাৎ 'এক'। অর্থাৎ, এই গোটা ব্রহ্মাণ্ডে সত্যি বলতে একটাই সত্তা আছে, কোনো আলাদা বা দ্বিতীয় কিছুর অস্তিত্বই নেই। সেই অষ্টম শতাব্দীতে আদি শঙ্করাচার্য উপনিষদ আর গীতা ঘেঁটে এই দর্শনের যে চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, তা আজও মানুষকে ভাবায়। অদ্বৈত বেদান্তের পুরো সারমর্মটা আসলে একটা ছোট্ট লাইনে লুকিয়ে আছে— "ব্রহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যা, জীব ব্রহ্মৈব নাপরঃ"
এর মানে হলো— একমাত্র ব্রহ্মই সত্যি, আমাদের চারপাশের এই যে দৃশ্যমান জগৎ, এটা আসলে একটা বিভ্রম বা চোখের ভুল। আর আমাদের সবার ভেতরে যে আত্মা রয়েছে, সেটা কোনো আলাদা জিনিস নয়, সেটাই স্বয়ং ব্রহ্ম! ভাবা যায়? এটা শুধু ঠাকুর-দেবতার গল্প নয়, বরং 'আমি কে?'— এই খোঁজে বের হওয়ার একটা অসাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক যাত্রা।

এখন প্রশ্ন হলো, এই 'ব্রহ্ম' আসলে কী? অদ্বৈত দর্শন বলছে, ব্রহ্ম আকাশের ওপারে সিংহাসনে বসে থাকা কোনো ঈশ্বর বা জাদুকর নন। বরং তিনি হলেন এক অসীম, রূপহীন, আর অনন্ত বিশুদ্ধ চেতনা। এর কোনো জন্ম নেই, মৃত্যু নেই, কোনো পরিবর্তনও নেই।
আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার কী জানেন? আমাদের ভেতরে যে 'আমি' বা আত্মা আছে, সেটা এই ব্রহ্মের কোনো ছোট্ট টুকরো বা স্ফুলিঙ্গ নয়। ওটা পুরোটাই ব্রহ্ম! অর্থাৎ, আপনার-আমার ভেতরের আত্মাই আসলে সেই অনন্ত পরমসত্তা। উপনিষদে যে বলা হয় "তত্ত্বমসি" (তুমিই সেই) বা "অহং ব্রহ্মাস্মি" (আমিই ব্রহ্ম)— এগুলো আসলে এই কথাই মনে করিয়ে দেয়। স্রষ্টা আর সৃষ্টির মধ্যে যে কোনো কাঁচের দেওয়াল নেই, অদ্বৈতবাদ সেটাই খুব জোর গলায় বলে।

এইবার আপনার মনে হতেই পারে— ভাই, সবই যদি এক হয়, সবই যদি ব্রহ্ম হয়, তাহলে আমরা এই দুনিয়ায় এত রং, এত বৈচিত্র্য, এত সুখ-দুঃখ দেখছি কেন?
খুব স্বাভাবিক প্রশ্ন! এখানেই আসে 'মায়া' বা 'অবিদ্যা'-র ধারণা। মায়া হলো অনেকটা ম্যাজিকের মতো, একটা মহাজাগতিক চশমা, যা আমাদের এক অখণ্ড ব্রহ্মকে হাজারো রূপে দেখাচ্ছে। শঙ্করাচার্য এটা বোঝাতে একটা দারুণ উদাহরণ দিয়েছিলেন— 'দড়িতে সাপ দেখার ভুল'। অন্ধকারে যেমন একটা সাধারণ দড়িকে দেখে আমরা সাপ ভেবে ভয়ে লাফিয়ে উঠি, ঠিক তেমনই অজ্ঞতার কারণে আমরা এক অখণ্ড ব্রহ্মের ওপর এই বৈচিত্র্যময় জগতের মিথ্যে ছবি চাপিয়ে দিই। যখন আলো জ্বলে ওঠে, অর্থাৎ যখন প্রকৃত জ্ঞান হয়, তখন আমরা দেখি ওটা তো শুধুই দড়ি! ঠিক তেমনি, আত্মজ্ঞান লাভ হলে এই দুনিয়ার মোহ আর ভেদাভেদ জাদুর মতো উধাও হয়ে যায়।

তাহলে এই অজ্ঞানতা থেকে বেরোনোর উপায় কী? অদ্বৈত বেদান্ত বলছে, উপায় হলো 'মোক্ষ' বা মুক্তি। তবে এই মুক্তি মানে কিন্তু মরে যাওয়ার পর কোনো স্বর্গে গিয়ে আরাম করা নয়। এটা হলো পুরোপুরি একটা মানসিক জাগরণ। এর জন্য আপনাকে বাড়ি ছেড়ে জঙ্গলে যেতে হবে না বা মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে হবে না; শুধু নিজের আসল পরিচয়টা চিনতে হবে।
অদ্বৈতবাদ মনে করে, শুধু বাহ্যিক নিয়মকানুন মেনে এই মুক্তি আসে না, এটা আসে নিখাদ 'জ্ঞান' থেকে। যখন কেউ গভীরভাবে ভেবে বুঝতে পারে যে, "আমি এই ছোট্ট শরীর বা চঞ্চল মন নই, আমিই সেই অনন্ত ব্রহ্ম"— তখনই সে 'জীবন্মুক্ত' হয়ে যায়। মানে, বেঁচে থেকেই সে মুক্ত! এই অবস্থায় মানুষ জাগতিক সব ভয়, দুঃখ আর আসক্তির ঊর্ধ্বে উঠে এক পরম শান্তির আনন্দ উপভোগ করে, যাকে বলে 'সচ্চিদানন্দ' (সৎ-চিৎ-আনন্দ)।

সব মিলিয়ে বলতে গেলে, অদ্বৈত বেদান্ত শুধু মোটা মোটা বইয়ের কিছু কঠিন তত্ত্বকথার সমষ্টি নয়। এটা আমাদের জীবনের এক বিশাল সম্ভাবনার মানচিত্র। এটা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে, আমাদের সব দুঃখ আর ভয়ের আসল কারণ হলো— আমরা নিজেকেই চিনি না! বাইরে কোথাও ঈশ্বর বা শান্তি না খুঁজে, অদ্বৈতবাদ আমাদের দৃষ্টিকে পুরোপুরি ভেতরের দিকে ঘোরাতে বলে। এটা বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, পরম সত্য আর কোথাও নেই, খোদ আপনার ভেতরেই লুকিয়ে আছে। এর চেয়ে সুন্দর আর ভরসার কথা আর কী হতে পারে?

Comments

Popular posts from this blog

অদ্বৈত বেদান্ত বনাম বৌদ্ধ বিজ্ঞানবাদ এবং ক্ষণভঙ্গবাদের স্বরূপ

বৌদ্ধ শাস্ত্রে হিন্দু দেবদেবী